Saturday, August 30, 2014

প্রেমপত্রঃ ৪

আজ বাড়ি ফিরছিলাম, তখনই ঘটনাটা হল। মানে এখন লিখছি, এখন ওটা "হয়েছিল" হয়ে গেছে। তখন হচ্ছিল। মানে তখনই হওয়ার ছিল। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পারমুটেশন-কম্বিনেশনের ঠিক এই বৈচিত্র্যটাই হওয়ার ছিল। এবং হ্যাঁ, এবারেরটা তোর ভালো না লাগতেও পারে। ঘটনাটা আমার বেশ লেগেছিল। তাই আমি লিখবো সেটাই স্বাভাবিক। তুই লিখলে হয়তো এটা লিখতিস না, বা দেখতিস না, বা দেখেও দেখতিস না। কি জানি। অনেককিছু হতে পারে কিনা।

আমাদের বাড়ি শিয়ালদা। এবার জানি না এই ছেলেমানুষি সবাই করে কিনা, কিন্তু আমরা এখনো দুজন দুজনকে বাড়ির লোকেশন তুলে খোঁটা দিই। ওই তুই বিড়াল না মুই বিড়াল টাইপ তোমার আমার ঝামেলাগুলো। ভাগ্য ভালো, আমরা গোটাগুটি আছি। দুটো ল্যাজের ডগায় পরিণত হইনি। সে ভালো একদিক দিয়ে। আমরা যে যেখানকার, সেখানটাকে তো খুব ঘেন্না করি। কারন একটা বিশাল অসহায় অবস্থা তো আমরা সবাই কাটাই বেশ কিছুকাল ধরে, তাই আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার জায়গাগুলো আমাদের বিশেষ পছন্দের হয় না। তাই কি এই পারস্পরিক নিন্দাবাদ? ভেবে দেখিস একবার।

তো যা বলছিলাম, আজ ফিরছি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে প্যান্ডেল অনেকটা উঁচু হয়ে উঠছে, কাজেই পুজো আসছে পুজো আসছে এরকম গন্ধ ভাসছে, এসব ভেবে ইতিউতি নাক চালিয়েও গন্ধ না পেয়ে বাড়ি ফিরছি।

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পাশেই একটা বাচ্চাদের মাঠ আছে। দোলনা, স্লিপ, ঢেঁকি এইসব আছে তাতে। আর সেটায় কিসব বয়সসীমা হয়ে গেছে। তা সেখানে বাবা-মা-বাচ্চা-বেলুন-আইসক্রিম সব মিলে প্রবল কলরোল হয়। আর তার পাশেই অবধারিত, রাস্তা, এবং ফুটপাথে পলিথিন টাঙ্গিয়ে থাকা কিছু জীব।

একটা মেয়ে, প্রবল মিষ্টি, সেজেগুজে বাবার সাথে, মানে মনে হল বাবার সাথেই, ক্যানো সেটা বুঝবি এক্ষুনি, টলমল করে হাঁটছে। রাস্তাতেই। মানে হয় বাড়ি ফিরছে বা মাঠে যাচ্ছে। সবে হাঁটতে শিখেছে, দেখেই বোঝা যায়।

তার ঠিক পিছনেই ওই একটা জীব, যার বাড়ি রাস্তাতে, সে একটা কাঠের ডাণ্ডায় চাকা লাগিয়ে সেটা নিয়ে খেলছে। মানে ওই আরকি, দৌড়চ্ছে। ছেলেটির, মানে জীবটির ঊর্ধ্বাঙ্গ বর্তমানের নায়কোচিত, মানে টপলেস, এবং নিম্নাঙ্গে একটা প্যান্ট, যার জন্মতারিখ সে নিজেই ভুলে মেরে দিয়েছে।

তো মেয়েটি, জীবটির হাতে খেলনা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল, জীবটা খেলার সাথী পেয়েছে ভেবে ওই চাকাওয়ালা ডাণ্ডাটা এগিয়ে দিলো, এরপর পাটিগণিতের নিয়মে এল বাবার বাবাসুলভ ধাতানি জীবটিকে, এবং মেয়ে হাত বাড়িয়েছে দেখে তাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লিখতাম না। লিখলাম, কারন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুজন একে অন্যকে চোখের আড়াল হতে দেয়নি।

কি জানি, হঠাৎ ক্যানো প্রিয়াঙ্কা-রিজওয়ানুর নামদুটো মাথায় এলো। প্রিয়াঙ্কাটা বুঝলাম, সামনেই কংগ্রেসের পার্টি অফিস ছিল তাই। অন্য নামটা কিজন্য মাথায় এলো, বুঝলাম না।

বললাম না, পুজোর গন্ধ পাইনি। শব্দে শব্দ ঢাকে, কাজেই গন্ধও ঢাকে গন্ধে।

কাঁচা টাকার গন্ধের সামনে শিউলির গন্ধ আজ অবধি টিঁকেছে কখনও?

Friday, August 1, 2014

কৈফিয়ত

ভালোবাসা ব্যাপারটা হেব্বি ঝামেলার।

ঝামেলার এই কারনেই, লোকে এটাকে প্রায়শই প্রেমের সাথে গুলিয়ে ফেলে। এবার প্রেম হল একটা দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। মানে তুমি রাজি-আমি রাজি-তোমারও থাকলো-আমারও থাকলো মার্কা ব্যাপার। এর সবথেকে কাছাকাছি জিনিসটা হল হাতিবাগান মার্কেটে ম্যাক্সি কেনা। মানে বাস্তবিকই, দু জায়গাতেই প্রবল দরদস্তুর চলে, আর তারপরেই হয় ম্যাক্সি বগলদাবা হয়, নয়ত পরের ক্রেতা আসে, এবং তাকেও বলা হয়-"শুধুমাত্র আপনার জন্যেই এই দাম দিদিভাই"।
এবার ভালোবাসার তো এই বেচাকেনা মার্কা দায় নেই। খানিক উইন্ডো শপিং মার্কা ব্যাপার। আমি দেখলাম, আমার ভালো লাগলো, কিন্তু তাকে বগলদাবা করতেই হবে, এ মাথার দিব্যি কেউ দিয়ে রাখেনি। সুতরাং সেখানে আবেগ ইত্যাদি অনেকটা খোলামেলা। তাই ব্যাপারটা অনেকক্ষেত্রেই নেহাত ভালোলাগাতেই আটকে যায়। তারপর আর এগোয় না। অবশ্য তার দায়ও থাকে না এগোনোর। এবং সেখানেই মূল পার্থক্য হয়ে যায় প্রেম আর ভালবাসার মধ্যে। প্রেম অনেক সংকীর্ণ, এবং তাই হয়তো তার পরিণতি আছে, সেটা ভালো হোক বা খারাপ। ভালোবাসাকে সেই পরিণতির খুপরিতে আটকে রাখা যায় না। তাই হয়তো ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট পরিণতি থাকা বা না থাকা ভালোবাসার থাকা বা না থাকাকে নিয়ন্ত্রণ করে না।

কিন্তু না এগোলেও, বা পরিণতি না পেলেও এই ভালোবাসাগুলো কি হারিয়ে যায়? বা এদের হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত? কক্ষনও না। এরা ছিল বলেই না সেইসব দিনগুলোয় আমাদের হাতের মুঠোয় ধরা থাকত ঘামে ভেজা চিঠি। সে চিঠি কাউকে দিয়ে ওঠা হয়নি। সময় ছিল না হয়তো, বা সুযোগ ছিল না। কিম্বা নেহাতই ধক ছিল না বলে বুকপকেটের লাব-ডুব চিঠি বেয়ে পৌঁছতে পারেনি তার গন্তব্যে। এদের জন্যই বসন্ত শুধুমাত্র ওই বিশ্রী একটা রোগের বাংলা নাম হয়ে থাকেনি। বসন্তের যে শিরশিরানি, সে কি খালি ওই এক এক পশলা দমকা হাওয়ার জন্য? নাকি ওই শিরশিরানির পিছনে ছিল এমনই কোনো "বলতে চেয়েও না বলতে পারা" কথা? কি জানি। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর এ ব্যাপারে কিছু স্পষ্ট করে জানায়নি কোনোদিন।

সেইসব টুকরো কথা, জমে থাকা রাগ, দুঃখ, অভিমান, ভালবাসা থেকে কিছু আপনমনে বকা প্রলাপ, কিছু সংলাপ, কিছু স্বগতোক্তি একজায়গায় জমিয়ে রাখার চেষ্টা শুরু করলাম এবার।

প্রেমপত্রঃ ৩

এতদিন যা যা বলেছি বা লিখেছি, সব বড়দের ব্যাপারস্যাপার। মানে আমি কামু বলতে একসময় যে মুখোপাধ্যায় বুঝতাম, আলবেয়ার নয়, সেটা আজকাল বেশ চেপে যেতে শিখেছি। তখনকার জীবন নিয়ে খুব বেশি কেউ জানতে চায় না, আমিও বলি না খুব একটা।

কিন্তু তাও, কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে তো, যেগুলো না থাকলে বেঁচে থাকাটা বড্ড আলুনি হত, বা নুনপোড়া হত। মানে এইসব মুহূর্তগুলো না থাকলে সত্যি আমরা হয়ত আজকের আমরা হয়ে উঠতাম না।

তখন ক্লাস এইট। আমাদের স্কুল সরকারি। সুতরাং অদরকারি জিনিসপত্র সারাবছর হত। আমরা এইটেও সাদা কেডস পরে তালে তালে হাত-পা নাচিয়ে ব্যায়াম করতাম। এবং কেডস আর হাফপ্যান্ট সপ্তাহে একদিন লাগতো, কাজেই বছর বছর সেগুলো কিনে দেওয়াটা দরকার, সেটা বাড়ির লোকের মাথাতেই আসেনি। আমরা তাই ছোটো হয়ে যাওয়া টাইট কেডস পরতে বাধ্য হতাম। রোম না গ্রিস না চিন, কোথায় যেন একটা অপরাধীদের পায়ে ইস্ক্রুপ লাগানো জুতো পরিয়ে এঁটে দিয়ে শাস্তি দিত। তারাও আমাদের থেকে আরামে থাকত। আর হাফপ্যান্ট তো ছোটো হয়ে হয়ে পুনম পাণ্ডের স্কার্টের থেকেও ছোট হয়ে গেছিল। আর ছিল কর্মশিক্ষা। তাতে আমরা মাটির ক্যাপসিকাম ইত্যাদি কালজয়ী শিল্প বানিয়েছিলাম।

আমার এইটের কর্মশিক্ষা পরীক্ষার দিন ছিল সেটা। পরীক্ষা দিয়ে বেরচ্ছি, তখন আমার এক বন্ধু, আচমকা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তার আগে আমি ইংরিজি সাহিত্য, ক্লাসের লার্নিং ইংলিশ বাদ দিয়ে, কিচ্ছু পড়িনি। মানে আমার ভয় করত। জানতাম, কিচ্ছু বুঝবো না। কাজেই অনেকে অনেককিছু পড়তে বললেও ভয়ে ওধার মাড়াইনি।

তো আমার সেই বন্ধু, সেদিন বলেছিল হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলোর কথা, বিশেষ করে অর্ডার অফ দ্য ফিনিক্স এর। আমি তখন সিনেমা দেখলেও বই পড়িনি। তো সে-ই সাহস দিয়ে বলল যে ওগুলো সোজা ইংরিজিতে লেখা, এবং পড়ে দিব্যি বোঝা যায়।

সেই শুরু। একমাসের মধ্যে প্রথম ৫ টা বই শেষ। তারপর পরের দুটোর জন্য দমবন্ধ অপেক্ষা। সিরিয়াস ব্ল্যাক কে আদর্শ মানুষ ভাবা (সেটা এখনো ভাবি, যতই স্নেপ ভালোমানুষ হয়ে উঠুন শেষে গিয়ে), ডাম্বেলডোরের মৃত্যু মানতে না পারা, ষষ্ঠ বই পড়ে হতাশ হওয়া, সপ্তম বইয়ের শেষ পাতা পড়ে শূন্যতা...............জীবন পাল্টে গেল।

সেই শুরু। সেই থেকে ভাষা আর অন্তরায় না। এখন তো সব পড়ি। পারলে হলুদ মলাটের চটি অবধি। ছাপার যোগ্য-অযোগ্য সব।

কিন্তু তুমি বলতেই পারো, এ আবার কিরকম প্রেমপত্র? এতে প্রেম কোথায়? গোটাটাই তো আমার স্মৃতিচারণ।

আসলে আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড আগে ছিল হ্যারি পটার সিরিজের কয়েকটা চরিত্রের নামে, আরও কিছু অক্ষরের সাথে। এখন সেই অক্ষরগুলো তাদের মতই আছে, শুধু চরিত্রের নামের জায়গায় তোমার নাম বসে গিয়েছে।

এ যদি প্রেম না হয়, তবে কোনটা প্রেম বলো?

প্রেমপত্রঃ ২

রাধারানী,

সেই কবে পায়ে তীর খেয়ে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছেড়েছি, এখন তো কেউ পাত্তাও দেয় না। এবং লোকজন না জেনে চরিত্র তুলে যা নয় তাই বলে। সারাজীবন একটাও ভুল কাজ না করেও লোকজন দাগিয়ে দিয়েছে "সবথেকে বড় পলিটিশিয়ান"। আরে গাধা, পলিটিশিয়ান হতাম যদি, সবশেষে সব ভাগ করে ফিরতাম নাকি? গোটাটাই হাতিয়ে নিতাম না?

সে যাকগে। সেসব তোমায় লিখতে চাই না। মানে লিখলেও আজ না। এখানে না।

কে এক "পত্নীর ভাই" লিখেছিল "বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা"। কি যাচ্ছেতাই ব্যাপার। সে লাইন আজকাল Gender Equality আন্দোলনেও দেখি ব্যবহার হচ্ছে। তা হোক। লোকজন করেকম্মে খাক। খামোকা আমার পিছনে লাগা ক্যানো?

গোটা মহাভারত জুড়ে, রাধারানী, তুমি ছিলে কই? আমি তো বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা এলাম। কংসমামা কে খতম করলাম। লোকজন আমায় মাথায় করে নাচলো। সেই ভিড়ে আমি যে চোখজোড়া খুঁজছিলাম, সেটা বাদে সব ছিল। আমার দরকার ছিল না এসব। ভালোই ছিলাম তো। কিন্তু ওই, কিসব নিয়তি হ্যানাত্যানা বলে আমায় লোকজন পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে এক অতিমানব বানালো। আমার চেনা জীবন থেকে টেনে আনলো, এনে জুতে দিলো এই রাজনীতির চক্করে। আমি একের পর এক অতিমানবীয় কাজের দায়িত্ব পেলাম। ভাবলাম, করি সব। তোমার কানে তো যাবে, তুমি যে আমার ছেলেমানুষি নিয়ে মজা করতে, সে আর পারবে না করতে। আমি একের পর এক এইসব করতে থাকলাম, আর খেয়ালও করলে না তুমি। আমিও তাই জেদ করেই যুদ্ধে না থেকেও থাকলাম। তুমি একবার মাত্র এসেছিলে। আমায় দেখে বললে, "এ কৃষ্ণ আমার কৃষ্ণ না"। আরে তোমার জন্যই আমি বাঁশি ছেড়ে রথের রাশ ধরেছিলাম হাতে। তোমায় দেখাবার জন্য, যে কৃষ্ণ একাই ভারতের ইতিহাস পাল্টে লেখার ক্ষমতা রাখে। সেই তুমি ভুল বুঝলে। আমার জাত তো গ্যালোই, পেটও ভরলো না।

সে যাকগে। সেসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু, এই আজকের দিনে এসেও, তোমায় এইসব নারীবাদীরা ট্র্যাজিক নায়িকা বানিয়েছে, আমাকে বানিয়েছে শরীরসর্বস্ব পুরুষের স্টিরিওটাইপ। ক্যানো?

এখনও রাতে তুমি ঘুমোতে চাইলে ফোন রেখে দিই। রাখতে হয়। হয়ত সারাদিন দেখিনি, কথা হয়নি, আমি চাই কথা হোক আরেকটু, তাও রেখে দিতে হয় ফোন। আমি-তুমি প্রেম করার খবর বাজারে চাউর হলে আমাকেই সিগারেট (আমার বন্ধুদের) আর চাউমিন (তোমার বন্ধুদের) খাওয়াতে হয়। তুমি ঝামেলা করলেও আমাকেই মিটমাট করতে হয়। তোমার মা, আমায় পুলিশে দিতে চান, মাঝেমাঝে ফোন করে আমার "বাজারদর" জানতে চান, জানতে চান কত পেলে আমি তোমায় ছেড়ে দেবো। কলেজে তুমি সঙ্গে থাকলেই লোকজন সিগারেট চেয়ে ফাটিয়ে দেয়। আমি-তুমি হয়ত কথা বলছি, তখনই আমাকে বা তোমাকে যত দরকার পড়ে লোকজনের।

এমনকি হয়ত সন্ধেবেলা এমনি তোমার সাথে নিরিবিলি বসে আড্ডা মেরে এসেছি, তাও ক্যানো লোকজন জানতে চাইবে "ফষ্টিনষ্টি" করছিলাম কিনা? এমনি শনি-রোববার আমি বাড়ি বসে থাকবো বলে বন্ধুদের সাথে কোথাও বেরবো না বললেও ক্যানো তারা ভাববে আমি আর তুমি কোথাও যাবো বলেই আমি তাদের কাটাচ্ছি? যেখানে হয়ত আমি আর তুমি এতদিন একসাথে থেকেও একসাথে কাটাবার সময় বের করতে পারিনি?

যাকগে, এর একটাও তোমার দোষ না। তোমাকেও এগুলো ভোগ করতে হয়। কিন্তু তাও তুমি ট্র্যাজিক নায়িকা, আমি চরিত্রহীন।

রাধারানী, তুমি প্লিজ পরজনমে হইও বনমালী। একবারের জন্য অন্তত।
 

প্রেমপত্রঃ ১

আমি সেই বিরল কলকাতাবাসীদের একজন, যার একটা ব্যক্তিগত ছাত রয়েছে।

আমার দোতলার ঘরের সামনে বারান্দা, তারপরেই একটা ছোটো ছাত।

আগে, যখন কাউন্টার বলতে বুঝতাম শিয়ালদা স্টেশনের যে জায়গাটা আমার মামারবাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রনপত্র দেয় সেটা বা প্রাচী সিনেমা হলের সেই ঘুপচি খোপটা, যেখান থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে গোলাপি কাগজের টুকরো ধরিয়ে দেয় সেটাকে, তখন বুঝিনি ছাত আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আমাদের ছাত বড় নয়, কিন্তু বড় মজার। কি নেই! একঝাঁক দড়ি এদিক-ওদিক বাঁধা। পাড়ায় আমাদের ছাতে অনেকক্ষণ রোদ থাকে। সেইজন্য, এবং আমার বাবা-মায়ের অসাধারণ সৌজন্যবোধের কারনে গোটা পাড়া আমাদের ছাদে কাপড় মেলত। এখন খানিক কমেছে, তাও দড়িগুলো রয়েই গেছে আমাদের পাড়ার মিলেমিশে থাকার চিহ্ন হিসেবেই। আর আছে আমার পৈতেতে পাওয়া সাইকেলটা। সামনের বাড়ির তিন বছরের বাচ্চাটার একটা পরিত্যক্ত সাইকেলও আছে, যেটা আমার সাইকেলের গায়েই হেলান দিয়ে রাখা। আরো কটা পুরনো পাতি ম্যাজিক দেখাবার সরঞ্জামও রয়েছে(বৃহত্তর পরিবারে শখের ম্যাজিশিয়ান থাকার, এবং সেই ম্যাজিশিয়ানের বাড়িতে জায়গা না থাকার ফল)।

আগে একতলার ঘরে থাকতাম, কারন সেখানে আমার বইগুলো আছে। এবার আস্তে আস্তে বয়েস বাড়ে। এবং ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই একদিন বুঝতে পারি, নিচের কলতলায় দাঁড়িয়ে খাওয়া সিগারেটের ধোঁয়া উপরে বাবা-মা’র নাক অবধি গিয়ে পৌঁছচ্ছে। সন্দেহ তীব্রতর হয় আমার ভোররাতে দুবার এন
.আর.এস হাসপাতাল ঘুরে আসার পর, এবং তারপর উপরের ঘরে আলোবাতাস বেশি, এই অজুহাতে আমায় উপরের ঘর দেওয়া হয়। এখনও ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই ধোঁয়া উপরের দিকেই ওঠে, কিন্তু জীবনবিজ্ঞানের সূত্র মেনে আমাকে আর হাসপাতাল যেতে হয় নি।
তো এই ছাত আমার বিছানা, ভেঙ্গে পড়ার জায়গা, উঠে দাঁড়ানোর জায়গা, কিছু চেয়ে না পাওয়ার দুঃখের সাক্ষী, কিছু পেয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলতে চাওয়ার রাগের সাক্ষী, কিছু চেয়ে সেটা পাওয়ার অনাবিল আনন্দের সাক্ষী।
ছাতে বসেই আমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কটা সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেক ভাগে ভাঙ্গা দলতন্ত্র বোঝা, সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্ক জোড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, জোড়া লাগা সম্পর্ক আবার ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত, এমনকি নতুন সম্পর্ক তৈরি করার আগেও তাই চূড়ান্ত টেনশনের মুহূর্তে ছাতে দাঁড়িয়ে একটা গোটা সিগারেট না খেয়ে কিছুতেই পেটের কথা মুখ অবধি এসে পৌঁছয়নি।
ছাত তাই আমার কাছে একটা জীবন্ত সত্ত্বা।

এতদিন স্বার্থপরের মত একা ছাতটা ভোগদখল করেছি।
তোকে ভাগ দিতে চাই।

নিবি?