১৯৯৭ সাল। আমার বয়স তখন ৬। বাড়িতে একটা সাদাকালো পাল্লাটানা টিভি, তার সামনে আবার একটা নীল কাঁচ লাগানো। ফর সেফটি মেজার্স। ফলে পাড়ার বাকিদের বাড়ির টিভি সাদাকালো হলেও আমাদের টেলেরামা টিভিটায় আমরা একটা আবছা নীল টিঞ্জ দেখতে পেতাম। অবশ্য পাড়ার বাকি কজনের বাড়িই বা টিভি ছিল? আমার খেয়াল আছে, একবার অ্যান্টেনা খুঁচিয়ে সিধে করতে গিয়ে ছাদে পড়ে যাওয়ার দশমিনিট পরে ঠান্ডা জল এসেছিল পাশের বাড়ি থেকে। কারণ পাড়ায় ওই একটা বাড়িতেই ফ্রিজ ছিল। অবশ্যই সেই অমৃত নষ্ট করি নি। এস পেলেগ্রিনো কোথায় লাগে তার কাছে?
এই নীল টিভি নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ ছিল না। আমরা নীলচে উত্তমকুমার দেখতাম, আকাশের রঙ কেবলমাত্র আমাদের টিভিতেই আকাশি দেখা যেত। আমরা তো কেউ কেউ আনন্দের আতিশয্যে সবুজ পাতাও দেখতাম। অবশ্য ততদিনে অলরেডি একবার রঙিন টিভি দেখে নিয়েছি, পাড়ার মৌমিতাদের বাড়ি। বিশ্বকাপ উদ্বোধন না ফাইনালের শুরুর মোচ্ছব, কি একটা দেখতে বাবা আমায় সেখানে বসিয়ে দিয়ে তাস পিটতে চলে গিয়েছিল। সেসব দেখিনি যদিও, মনেও নেই ভালোমত। টিভির সামনে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে।
(নোট টু সেলফঃ একদা আমি মৌমিতার সাথে পাড়ায় খেলাধুলো করতাম। তারপর আমি বাড়িতে থাকতে শুরু করে দিলাম, মৌমিতাও ডাকতে এসে জবাব না পেয়ে ফিরে যেতে থাকলো-এই মর্মে একটা রিভার্স পেট্রিয়ার্কি দেখতে চাওয়ার কুতর্ক করতে হবে, বা একটা আবেগে জ্যাবজ্যাবে “প্রেম মানে ছ বছর, প্রেম মানে বিমানকাকুর টিভি, প্রেম মানে মৌমিতা” মর্মে ছ লাইনের গর্ভস্রাবও নামানো যেতে পারে। লোকে খুব খাবে।)
নীল কাঁচ দিয়ে “বিমানবাবুর যে ধন আছে, মোদের ঘরেও সে ধন আছে” করার চেষ্টা চললো। সফল হল না। আমি অবশ্য একবার চেষ্টা করেছিলাম, নীল কাঁচ লাগানোয় যখন ছবি নীল হয়েছে, দিদির থেকে প্রাপ্ত ভৌতবিজ্ঞানের জ্ঞান (লাল-সবুজ-নীল দিয়েই আসলে সব রঙ তৈরি) প্রয়োগ করে টিভিকে রঙিন বানানোর। তুই “পান্না কোথায়” পড়েছে থাকলে রিলেট করতে পারবি। লাল আর সবুজ সেলোফেন পেপার হাতেপায়ে ধরে কেনালাম। তারপর সে দুটোকে একটা অন্যটার উপর লাগালাম। সবটা নীল কাঁচের উপর আটকে দিলাম। ফলাফল “সুপার ক্যালকাকালার” এর থেকেও ভয়াবহ হয়েছিল, বলাই বাহুল্য। কিছুই দেখা যায় নি, বরং ধাতানি খেয়েছিলাম, ঠাকুমার জননী দেখা বিঘ্নিত হয়েছিল বলে।
এই অবস্থায়, আমাদের সাথে রঙিন জগতের এক ও একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল সিনেমা। কাজেই সিনেমা দেখতে যাওয়ায় আমরা কোনো বাছবিচার রাখতাম না। আমার খেয়াল আছে, প্রাচী সিনেমা হলে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যার নাম ছিল “সিঁথির সিঁদুর”। উফফ...কিছুই খেয়াল নেই, খালি তাপস পাল না অভিষেক, কে একটা আলের ধারে একদল লোককে র্যাচা ক্যাল দিয়েছিল, আর তাদের মধ্যে সবথেকে বেঁটেটা পালাতে গিয়ে দড়াম করে জলে পড়ে গিয়েছিল। কাজেই বোঝাই যাচ্ছে, তখন আমরা দল বেঁধে কোন মাত্রায় সিনেমা দেখতে যেতাম। ঠাকুমা অবধি যেত, কাজেই আমাকে নিয়ে যেতেই হত। এমনও হয়েছে, মেসো-মাসিরা এসেছে, রাতে থাকার কড়ার হল পাঁঠার মাংস আর সিনেমা প্রোভাইড করতে হবে। আমরা মেট্রোয় লাস্ট শো দেখে হেঁটে বাড়ি ফিরেছি, তারপর বাবা হাত-পা ধুয়ে মাংস সবেমাত্র চড়িয়েছে। সম্ভবত সিনেমাঘটিত নস্ট্যালজিয়ার এই দৃশ্যটা আর কোনোদিন ফেরত পাওয়া যাবে না। এখন তো যা সিনেমা দেখি, সবই একা, ভুতের মত। বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ...ইত্যাদি ইত্যাদি...(ফোঁস)
এই সিনেমাহলেই তার সাথে আমার প্রথম দেখা। কাজেই, বুঝতেই পারছিস, ইমপ্যাক্টটা ঠিক কতটা জম্পেশ হতে পারে।
তখন টিভিতে বোধহয় রঙ্গোলি বলে একটা ওই গানের অনুষ্ঠান হত। সেখানেই বোধহয় প্রথম দেখেছিলাম। অ-নায়কোচিত চেহারা নিয়ে চক্কর মারছেন, আর গানের গলাটা, বললে বিশ্বাস করবি না, অবিকল বিনোদ রাঠোরের মত। “কোই না কোই চাহিয়ে, প্যার করনেওয়ালা”। এই গানটা খুব দিয়েছে এককালে। কাজেই সিনেমা দেখতে ঢুকে দেখলাম, ওমা, এ তো সেই ছেলেটাই। এখানে আবার দুজন মেয়েকে কি নাচটাই না শেখাচ্ছে। সিনেমার নাম-“দিল তো পাগল হ্যায়”।
এবার এই সিনেমাটা সম্ভবত অনেক কারণে মাইলস্টোন। প্রথমত, অক্ষয়কুমারের মত একটা সিমপ্যাথিখোর ক্যারেক্টার, যে কিনা সকল “জয় ক'রে তবু ভয় কেন তোর যায় না,. হায় ভীরু প্রেম, হায় রে...আশার আলোয় তবুও ভরসা পায় না, মুখে হাসি তবু চোখে জল না শুকায় রে” আশিকদের ম্যাসকট হয়ে উঠবে। এবং আমরা সবাই বাধ্যতামূলকভাবে ওইরকম ভাবে গড়েপিটে নেবো নিজেকে। মাধুরী দীক্ষিত, বলিউডের শেষ সম্রাজ্ঞী, যার পরে ওইরকম গ্রেস নিয়ে আর কেউ আসতে পারে নি, তার অসামান্য পারফর্মেন্স। আমার বাবা অবশ্য অন্য কারণে দিল তো পাগল হ্যায় কে বলিউডের শ্রেষ্ঠ সিনেমা মনে করে। বাবার কারণটাও অকাট্যঃ “ওই ভাঙা পা নিয়ে করিশ্মার যা নাচ...উফফ...”। এবং শাহরুখ নিজে। তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন।
আমি শাহরুখের ফ্যান। হ্যাঁ, উইট, সাক্ষাৎকার ইত্যাদির তো বটেই, কিন্তু অভিনয়েরও ফ্যান। কেন, বলছি না, কারণ এক্ষুনি লোকে “স্তানিস্লাভস্কি! বুবপ্রেসস্কি! টিটসাকস্কি! নোমচমস্কি” বলে তেড়ে আসবে। আমি ডন থেকে শুরু করে ফ্যান অবধি, প্রতিটি সিনেমা ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখেছি। তার মধ্যে মুর্শিদাবাদ থেকে কোলকাতায় ছুটে এসে সিনেমা দেখা, আগের রাতের নেশার হ্যাংওভার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া, চাকরি যাওয়ার ভয় তুচ্ছ করে সিনেমা দেখে আসা-সবই আছে। এমনকি একটা সম্পর্ক কাটিয়ে দেওয়া অবধি, এবং একটা সম্পর্ক তৈরি করতে চেষ্টা করাও। সে সবই তো তোর জানা।
আসলে ব্যাপারটা সেইটা নয় যে শাহরুখ পৃথিবীর সেরা অভিনেতা কিনা। ব্যাপার হচ্ছে শাহরুখ আমার বেড়ে ওঠার সাথে কতটা সম্পৃক্ত। শাহরুখের হাত ধরেই সম্ভবত আমার স্টকার রোম্যান্স থেকে মোটামুটি একটা সফিস্টিকেশনের খোঁজ করা শুরু। শাহরুখ দিলওয়ালে দুলহানিয়াতে স্টকার রোম্যান্সের ধ্বজা উড়িয়েছেন বটে (যে জন্য বাকিদের মত এই সিনেমা নিয়ে আমার ততটাও আদিখ্যেতা নেই, কাল হো না হো নিয়ে আছে, কুছ কুছ হোতা হ্যায় নিয়েও আছে), কিন্তু তার পরেই, ইয়েস বস বা পরদেশ থেকেই মোটামুটিভাবে এই জাতের চরিত্র সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন। যেখানে ভারতের মেনস্ট্রিম সিনেমা তখনও ডমিনেট করছে এই জাতের চরিত্র। এমনকি এখনও এই চরিত্রদেরই দেখতে পাওয়া যায়। সেদিক থেকে বলতে গেলে, শাহরুখ আমায় প্রেম করা শিখিয়েছেন, রোম্যান্স কাকে বলে বুঝিয়েছেন। অন্তত মহিলাদের অবজেক্ট মনে করা থেকে তো সচেতনভাবেই আগলে রেখেছেন।
হ্যাঁ, সে লোকে এইসব নিয়ে খিল্লি করতেই পারে, আমার তাতে খুব একটা কিছু যায় আসে না। ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার তো, আজকাল একেবারেই সেসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। কেউ কিছু বললে মুচকি হেসে কাটিয়ে দিই, তারপর বাড়ি এসে বাজিগর বা কাল হো না হো চালিয়ে দিই। আর কিছু না থাকলেও, এদের জন্যই গুরু আমার কাছে আজীবন গুরু থাকবেন।
তা এতবড় ফ্যান হলেও, আজ অবধি গুরুকে চোখের দেখা দেখতে পাইনি। হ্যাঁ, অফিসের কাজে বুম্বে গিয়েছি। মান্নাতের সামনে দাঁড়িয়ে সেই গ্রামের মেলার স্টুডিওর মত একখানা পোজ দিয়ে ছবিও তুলেছি বটে, কিন্তু ঈশ্বরকে দেখি নি। একবারই সুযোগ এসেছিল, সেখানার পাসও জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু নিজের জন্য নয়। নিজের থেকেও "আপাতত" যাকে বেশি ভালোবাসি তার, অর্থাৎ তোর খুব ইচ্ছে ছিল অনুষ্ঠানটা দেখার। আমি কাল হো না হো দেখে বড় হয়েছি, তোকে টিকিট না দিলে গুরু স্টেজ থেকে নেমে এসে আমায় ঠাটিয়ে থাবড়া মারতেন। “মাজাকি হচ্চে? এই শিখিয়েছি তোমায়?”-মর্মে। কাজেই, দেখা হয়ে ওঠে নি। আর গুরু তো আমাদের মনের মধ্যে আছে। সেই সেবার, যখন কুছ কুছ হোতা হ্যায়-সম ডিলেমায় পড়ে গিয়েছিলাম, অর্থাৎ সরে আসবো, না পড়ে থাকবো, সেই সময়ও তো গুরুকে ভেবেই পড়ে থেকেছিলাম। ফল, সে তো সবাই জানে।
সম্ভবত এই লেখাটাতেই তোকে উদ্দেশ্য করে অনেককিছু লিখলেও, তোর উদ্দেশ্যে সরাসরি কিছু বলছি না। তার একটাই কারণ, তোর সবটাই জানা। আর আরেকটা কারণ, গুরু আমাদের শিখিয়েছেন, কিভাবে সব কথা বলতে নেই, কিছু কথা অনুচ্চারিত রাখতে হয়। সব জিনিস বললে মজাটাই মাটি হয়ে যায়। আর মাঝে মাঝে কাল হো না হো-র ডায়েরির মত, ফাঁকা পাতা থেকে একের পর এক মিথ্যে বলে যেতে হয়। অন্যকে খুশি রাখতে, অন্যকে কম দুঃখ দেওয়ার জন্য। নইলে এই শহরে একা থাকতে, একা পুজো কাটাতে আমারও কি কষ্ট হয় না?
যাক গে। মেলা কথা বলে ফেলা গেল, এবার আবার গুরু। আজকাল দেখি, বয়স বাড়ছে। চুলের মধ্যে অবাধ্য রূপোলি রেখা, চোখের কোনে বেয়াড়া ছাপ রেখে গিয়েছে বয়স। আমাদের রাজপুত্র বুড়ো হচ্ছেন। আমরা বড় হচ্ছি। এখন হয়তো পিছন ফিরে দেখলে অনেকেই সেই স্বপ্ন দেখানোর ফিরিওয়ালাকে স্বীকার করতে চাইবে না। অনেকদিন যে ব্লকবাস্টার দিচ্ছেন না গুরু।
কিন্তু ওই যে তিনি। আমাদের দিকে পিছন ফিরে হালকা কান্নিক মেরে দু হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের প্রেমের মত সতেজ, প্রথম চুমুর মত আবেগময়, প্রেমের অঙ্গীকারের মত অকপট। এখনও যদি গালে টোল ফেলে বলে ওঠেন, "দিল লেকে দিল দিয়া হ্যায় সওদা প্যার কা কিয়া হ্যায়", আসমুদ্রহিমাচল সকলের রক্ত উথালপাথাল। তার মাঝে ঈশ্বরের মত দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের ছেলেবেলা নিয়ে, আমাদের “শারুপ খান”।
No comments:
Post a Comment