আমি সেই বিরল কলকাতাবাসীদের একজন, যার একটা ব্যক্তিগত ছাত রয়েছে।
আমার দোতলার ঘরের সামনে বারান্দা, তারপরেই একটা ছোটো ছাত।
আগে, যখন কাউন্টার বলতে বুঝতাম শিয়ালদা স্টেশনের যে জায়গাটা আমার মামারবাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রনপত্র দেয় সেটা বা প্রাচী সিনেমা হলের সেই ঘুপচি খোপটা, যেখান থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে গোলাপি কাগজের টুকরো ধরিয়ে দেয় সেটাকে, তখন বুঝিনি ছাত আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আমাদের ছাত বড় নয়, কিন্তু বড় মজার। কি নেই! একঝাঁক দড়ি এদিক-ওদিক বাঁধা। পাড়ায় আমাদের ছাতে অনেকক্ষণ রোদ থাকে। সেইজন্য, এবং আমার বাবা-মায়ের অসাধারণ সৌজন্যবোধের কারনে গোটা পাড়া আমাদের ছাদে কাপড় মেলত। এখন খানিক কমেছে, তাও দড়িগুলো রয়েই গেছে আমাদের পাড়ার মিলেমিশে থাকার চিহ্ন হিসেবেই। আর আছে আমার পৈতেতে পাওয়া সাইকেলটা। সামনের বাড়ির তিন বছরের বাচ্চাটার একটা পরিত্যক্ত সাইকেলও আছে, যেটা আমার সাইকেলের গায়েই হেলান দিয়ে রাখা। আরো কটা পুরনো পাতি ম্যাজিক দেখাবার সরঞ্জামও রয়েছে(বৃহত্তর পরিবারে শখের ম্যাজিশিয়ান থাকার, এবং সেই ম্যাজিশিয়ানের বাড়িতে জায়গা না থাকার ফল)।
আগে একতলার ঘরে থাকতাম, কারন সেখানে আমার বইগুলো আছে। এবার আস্তে আস্তে বয়েস বাড়ে। এবং ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই একদিন বুঝতে পারি, নিচের কলতলায় দাঁড়িয়ে খাওয়া সিগারেটের ধোঁয়া উপরে বাবা-মা’র নাক অবধি গিয়ে পৌঁছচ্ছে। সন্দেহ তীব্রতর হয় আমার ভোররাতে দুবার এন.আর.এস হাসপাতাল ঘুরে আসার পর, এবং তারপর উপরের ঘরে আলোবাতাস বেশি, এই অজুহাতে আমায় উপরের ঘর দেওয়া হয়। এখনও ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই ধোঁয়া উপরের দিকেই ওঠে, কিন্তু জীবনবিজ্ঞানের সূত্র মেনে আমাকে আর হাসপাতাল যেতে হয় নি।
তো এই ছাত আমার বিছানা, ভেঙ্গে পড়ার জায়গা, উঠে দাঁড়ানোর জায়গা, কিছু চেয়ে না পাওয়ার দুঃখের সাক্ষী, কিছু পেয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলতে চাওয়ার রাগের সাক্ষী, কিছু চেয়ে সেটা পাওয়ার অনাবিল আনন্দের সাক্ষী।
ছাতে বসেই আমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কটা সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেক ভাগে ভাঙ্গা দলতন্ত্র বোঝা, সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্ক জোড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, জোড়া লাগা সম্পর্ক আবার ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত, এমনকি নতুন সম্পর্ক তৈরি করার আগেও তাই চূড়ান্ত টেনশনের মুহূর্তে ছাতে দাঁড়িয়ে একটা গোটা সিগারেট না খেয়ে কিছুতেই পেটের কথা মুখ অবধি এসে পৌঁছয়নি।
ছাত তাই আমার কাছে একটা জীবন্ত সত্ত্বা।
এতদিন স্বার্থপরের মত একা ছাতটা ভোগদখল করেছি।
তোকে ভাগ দিতে চাই।
নিবি?
নিবি?
যাদুবাকসো তুই
ReplyDelete